বিডি জাগরণ । প্রতিবাদের প্রথম কন্ঠ
বিডি জাগরণ । প্রতিবাদের প্রথম কন্ঠ
Sunday, 19 Jul 2026 00:00 am
বিডি জাগরণ । প্রতিবাদের প্রথম কন্ঠ

বিডি জাগরণ । প্রতিবাদের প্রথম কন্ঠ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (এইচএসআইএ) তৃতীয় টার্মিনাল চালুকে কেন্দ্র করে দেশের বাণিজ্যিক বিমান চলাচল খাতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে চারটি দেশীয় এয়ারলাইন্স। ২০২৭ সালের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, এয়ার অ্যাস্ট্রা এবং নভোএয়ারের বহরে লিজের মাধ্যমে যুক্ত হবে আরও ৪০টি উড়োজাহাজ। এর ফলে চারটি এয়ারলাইন্সের সম্মিলিত বহর বর্তমানের ৫১টি থেকে বেড়ে ৯১টিতে পৌঁছাবে, যা প্রায় ৭৮ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বর্তমানে বিমানবন্দরের বিদ্যমান টার্মিনালটি বছরে ৮০ লাখ যাত্রী ধারণক্ষমতা নিয়ে নির্মিত হলেও ২০২৫ সালে সেখানে ১ কোটি ২৭ লাখ যাত্রী সেবা নিয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২৩ সালে ১ কোটি ১৭ লাখ।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধন করা হতে পারে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে বছরে অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী এবং প্রায় ৫ লাখ টন কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা যুক্ত হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজারের প্রায় ৬৫ শতাংশ বিদেশি এয়ারলাইন্সের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দেশে ৩৮টি বিদেশি এয়ারলাইন্স পরিচালিত হলেও দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো নতুন বহর ও রুট সম্প্রসারণের মাধ্যমে সেই বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়।

বিমান চলাচল বিশ্লেষক ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক পরিচালক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএটিএ) পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী এক দশকে ঢাকাকেন্দ্রিক যাত্রীসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাতে পারে। তাই এই বহর সম্প্রসারণ এখন বাণিজ্যিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার, বোয়িং ৭৭৭, বোয়িং ৭৩৭-৮ এবং এটিআর ৭২-৬০০সহ বিভিন্ন ধরনের উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। এসব উড়োজাহাজ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে দেশের বিমান খাতের আয় বাড়বে, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে এবং যাত্রীসেবার মান আরও উন্নত হবে।

বিমানের বহরে যুক্ত হবে আরও ১০ উড়োজাহাজ

জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০২৭ সালের মধ্যে লিজের মাধ্যমে ১০টি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। এতে বিমানের বহর বর্তমান ১৯টি থেকে বেড়ে ২৯টিতে উন্নীত হবে।

এই পরিকল্পনা বিমানের ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার পৃথক প্রকল্পের বাইরে। প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ওই উড়োজাহাজগুলো ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে।

এরই মধ্যে ছয় বছরের জন্য তিনটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ড্রাই লিজে নেওয়ার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগও নিয়েছে সরকার।

বর্তমানে বিমান ২২টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ভবিষ্যতে পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় রুট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ইউএস-বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণ

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা বর্তমানে ২৫টি উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও ২১টি বোয়িং ৭৩৭-৮ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা দেশের বেসরকারি খাতে এককভাবে সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণ উদ্যোগ। এর সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ১ দশমিক ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আগামী ২৯ জুলাই বোয়িংয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। ইউএস-বাংলা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।

প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র কামরুল ইসলাম জানান, ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করা হবে, যাতে যাত্রীদের ঢাকার ওপর নির্ভরশীলতা কমে।

প্রাথমিকভাবে জেদ্দা, মদিনা, বাহরাইন, হংকং, কলম্বো, কাঠমান্ডু ও জোহর বাহরুতে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপে ২০২৮ সালের মধ্যে ইতালি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে কানাডার টরন্টো ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ফ্লাইট চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এয়ারলাইন্সটি।

আন্তর্জাতিক রুটে যাচ্ছে এয়ার অ্যাস্ট্রা

বর্তমানে চারটি এটিআর ৭২-৬০০ উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী এয়ার অ্যাস্ট্রা ২০২৭ সালের মধ্যে বহর ১০টিতে উন্নীত করবে। দুটি নতুন টার্বোপ্রপের পাশাপাশি ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে চারটি বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজ যুক্ত করে প্রথমবারের মতো ওয়াইড-বডি পরিচালনায় যাবে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আসিফ বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল দেশের বিমান শিল্পের প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। অতীতে টার্মিনাল ও পার্কিং সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে বহর বাড়ানো সম্ভব ছিল না। এখন দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো সম্প্রসারণ না করলে বিদেশি এয়ারলাইন্স অতিরিক্ত সক্ষমতার সুবিধা নিয়ে বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।

এয়ার অ্যাস্ট্রা নেপাল, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে নভোএয়ার

দীর্ঘদিন লিজে উড়োজাহাজ সংগ্রহে জটিলতার পর নভোএয়ারও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বর্তমানে তিনটি উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে দুটি এবং ছয় মাস পর আরও একটি লিজ উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করবে।

প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুরের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই, শারজাহ ও মাসকাটে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার লক্ষ্যে বোয়িং ও এয়ারবাস উড়োজাহাজের বিভিন্ন বিকল্প মূল্যায়ন করছে।

বৈশ্বিক লিজদাতাদের আস্থা বেড়েছে

বিমান খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে উড়োজাহাজ পুনর্দখলের কোনো নজির না থাকা, নিয়ন্ত্রক তদারকি জোরদার হওয়া এবং কেপ টাউন কনভেনশন বাস্তবায়নের ফলে আন্তর্জাতিক লিজদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা বেড়েছে। এর ফলে তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক শর্তে আধুনিক উড়োজাহাজ লিজ নেওয়া সহজ হচ্ছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলেও ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাহিদা সামাল দিতে একটি মাত্র রানওয়ে যথেষ্ট হবে না। দেশের বিমান পরিবহন খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ভবিষ্যতে আরও বড় ও আধুনিক একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের প্রয়োজন হবে।